ইতিহাস, অর্থনীতি আর সাম্প্রতিক ক্রিপ্টো বাজারের আচরণ মিলিয়ে দেখলে একটা সন্দেহ বেশ যৌক্তিক বলেই মনে হয়। বিষয়টি উদাহরণসহ তুলে ধরার চেষ্টা করি। পুঁজিবাদ কখনোই সরল পথে সম্পদ দখল করে না। তার আসল শক্তি বন্দুক বা ট্যাংকে নয়, শক্তি তথ্যের নিয়ন্ত্রণে, ভাষার দখলে, আর ভয় উৎপাদনের দক্ষতায়। ইতিহাসে যেসব সম্পদ প্রকৃত অর্থে মূল্যবান, সেগুলোর ক্ষেত্রেই প্রথমে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার চালানো হয়েছে। স্বর্ণ, তেল, হীরা, ইউরেনিয়াম কিংবা আজকের লিথিয়াম—সবখানেই প্যাটার্ন এক।
বিটকয়েন সেই একই তালিকার নতুন সংযোজন।
প্রথমে বলা হলো, এর কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই। তারপর বলা হলো, এটা অপরাধীদের মুদ্রা। এরপর পরিবেশ ধ্বংসের গল্প। এখন বলা হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ আসছে, নিষেধাজ্ঞা আসছে, সব শেষ। আশ্চর্যভাবে এসব বক্তব্য ঠিক তখনই জোরালো হয়, যখন বাজার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট এলাকায় পৌঁছায়।
এটা কি কাকতাল?
স্বর্ণের সাথে তুলনা করলে ছবিটা পরিষ্কার হয়
একসময় স্বর্ণকে বলা হতো অনুৎপাদনশীল, পুরোনো যুগের ধাতু। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছিল, আধুনিক অর্থনীতিতে স্বর্ণের দরকার নেই। ফলাফল কী হয়েছিল? খুচরা বিনিয়োগকারীরা বিক্রি করেছে, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কর্পোরেট ফান্ডগুলো নীরবে মজুদ বাড়িয়েছে। আজ সেই স্বর্ণই সংকটকালে শেষ ভরসা।
বিটকয়েনের ক্ষেত্রেও একই নাটক চলছে। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়—এটা রাষ্ট্রের সীমার বাইরে।
ভয় তৈরি করা হয়, কারণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন
বিটকয়েনের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো, এটা কোনো সাম্রাজ্যের অনুমতি চায় না। এখানে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপ নেই, কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রাতারাতি সরবরাহ বাড়ানো যায় না। এই বৈশিষ্ট্যটাই পুঁজিবাদী কেন্দ্রগুলোর জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
তাই তারা সরাসরি নিষিদ্ধ করতে পারে না। কারণ প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা যায় না, শুধু ব্যবহারকারীকে ভয় দেখানো যায়।
এই ভয়টা কার জন্য? ছোট লগ্নিকারকের জন্য। যিনি খবরের শিরোনাম দেখেন, বিশ্লেষণ না করে আতঙ্কে বিক্রি করেন।
আর সুযোগটা কার জন্য? যারা তথ্য আগেই জানে। যারা জানে, কোন সংবাদটা আসছে, কখন আসছে, আর বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
২০২০ সালের কোভিড ধস এর ক্লাসিক উদাহরণ। তখন বলা হয়েছিল, বিটকয়েন ব্যর্থ হয়েছে। অথচ ঠিক সেই সময়েই বড় বড় ফান্ড, কর্পোরেট ট্রেজারি আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রবেশ শুরু করে। কয়েক বছর পর তারাই আবার বলল, বিটকয়েন ডিজিটাল গোল্ড।
এই দ্বিচারিতা কোনো ভুল নয়, এটা কৌশল।
মিডিয়া এখানে নিরপেক্ষ নয়
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মিডিয়া খুব কম ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ থাকে। যাদের হাতে মূলধন, তাদের বয়ানই প্রচারিত হয়। তাই বিটকয়েন যখন সাধারণ মানুষের হাতে থাকে, তখন সেটা বিপজ্জনক। আর যখন ধীরে ধীরে বড় খেলোয়াড়দের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সেটাই বৈধ, নিরাপদ, ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেট হয়ে ওঠে।
ভাষা বদলায়, অবস্থান বদলায়, কিন্তু লক্ষ্য বদলায় না—নিয়ন্ত্রণ।
তাহলে সাধারণ লগ্নিকারকের করণীয় কী?
প্রথমত, আতঙ্ক আর বাস্তবতাকে আলাদা করতে শেখা। দ্বিতীয়ত, বুঝতে হবে ইতিহাস কখনো হুবহু ফিরে আসে না, কিন্তু ছক বদলায় না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রশ্ন করতে হবে—যে সম্পদকে নিয়ে এত ভয় ছড়ানো হচ্ছে, সেটাই কেন আবার সবচেয়ে শক্তিশালী ফিনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো নীরবে সঞ্চয় করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই অনেক প্রচারণার মুখোশ খুলে পড়ে।
শেষ কথা
বিটকয়েন শুধু একটি ডিজিটাল সম্পদ নয়। এটা ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন। তাই এটাকে ঘিরে লড়াই শুধু চার্টের নয়, এটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আদর্শিক লড়াই।
ইতিহাস বলে, আতঙ্ক যাদের মধ্যে ছড়ানো হয়, সম্পদ তাদের হাতেই থাকে না। প্রশ্ন হলো, এবারও কি আমরা সেই পুরোনো ভূমিকা পালন করবো, নাকি ভয়কে পাশ কাটিয়ে বাস্তবতা বোঝার সাহস দেখাবো?
এই সিদ্ধান্তটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, বিটকয়েন কার সম্পদ হয়ে থাকবে।
